কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ট্রাম্পের শুল্কনাটক ও ঢাকার কূটনৈতিক ঘোর

আসিফ শওকত কল্লোল [প্রকাশ : কালবেলা, ০৫ মার্চ ২০২৬]

ট্রাম্পের শুল্কনাটক ও ঢাকার কূটনৈতিক ঘোর

আজ ১০ শতাংশ শুল্ক হয়তো স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু ১৫০ দিনের পর কী হবে, তা কেউ জানে না, হয়তো ট্রাম্পও না। তাই এ সময়টা উদযাপনের নয়, প্রস্তুতির। কারণ ট্রাম্পের রাজনীতিতে সবচেয়ে স্থায়ী জিনিসটি হলো অস্থিরতা। আর সেই অস্থিরতার ভেতর টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো নীতিগত দৃঢ়তা ও কৌশলগত বুদ্ধি। নইলে ইতিহাস আমাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করবে যে, আমরা আদালতের রায়ে পাওয়া সুযোগকে হাততালিতে নষ্ট করেছি আর ট্রাম্পের নাটকে নীরব দর্শক হয়েই রয়ে গেছি

 

 

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে কিছু চরিত্র থাকে, যাদের উপস্থিতিতেই নাটকের পর্দা নড়ে ওঠে। ডোনাল ট্রাম্প সেই বিরল প্রজাতির রাজনীতিক, যিনি আইনকে দেখেন বাধা হিসেবে, আদালতকে দেখেন অসুবিধা হিসেবে আর শুল্ককে দেখেন সর্বময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস সুপ্রিম কোর্ট যখন তাঁর পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এ অধ্যায়ের ইতি বুঝি টানল আদালত। কিন্তু ট্রাম্প-নাটকে ‘ইতি’ বলে কিছু নেই, আছে কেবল বিরতি। বিরতির পরেই নতুন অঙ্ক।

 

 

 

রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প আবার কলম ধরলেন। আগের অবৈধ শুল্কের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন শুল্কের জন্ম, এই হলো ট্রাম্পীয় ধারাবাহিকতা। এবার হাতিয়ার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ১২২’। যুক্তি সোজা: বাণিজ্যঘাটতি আছে, তাই শুল্ক চাই। ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক প্রায় সবার জন্য। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। আইন বদলাল, নাটক বদলাল না।

 
 
 

এ পুরো ঘটনায় সবচেয়ে ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো, ট্রাম্প একে একে আদালতকে আক্রমণ করছেন, বিচারপতিদের ‘লজ্জা’ দিচ্ছেন। আবার সেই আদালতের রায় পাশ কাটিয়ে নতুন আইনি ফাঁক খুঁজে বের করছেন। যেন সংবিধান একটি রাবারব্যান্ড। টান দিলে বাড়ে, ছেড়ে দিলে সঙ্কুচিত হয় আর প্রয়োজনে ছিঁড়েও যায়। ট্রাম্পের কাছে আইন মানে নীতির কাঠামো নয়; আইন মানে একটি টুলবক্স।

 
 

কিন্তু এ নাটকের দর্শক শুধু আমেরিকান ভোটার নয়। বিশ্বজুড়ে ছোটবড় সব অর্থনীতি এ শুল্ক-দোলাচলে দুলছে। আর সেই দোলাচলের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ, কখনো দর্শক, কখনো অনিচ্ছুক চরিত্র।

 

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’, যা নিয়ে ঢাকায় এত উচ্ছ্বাস, এত আত্মতৃপ্তি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর হঠাৎ করেই আইনি ভিত্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। যে শুল্ক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে এ সমঝোতা, সেটিই যদি অবৈধ হয়, তাহলে চুক্তির ভবিষ্যৎও ঝুলে যায় বাতাসে। কাগজে কলমে চুক্তি থাকলেই কি বাস্তবে তার ওজন থাকে? আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাগজের ওজন মাপা হয় আদালতের রায়ে, নির্বাহী আদেশে নয়।

 

 

এখানেই ঢাকার কূটনৈতিক বাস্তবতা খানিকটা করুণ হয়ে ওঠে। আমরা যেন আগেভাগেই আনন্দে মেতে উঠেছিলাম, ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে আসা শুল্ককে বড় সাফল্য ভেবে। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনীতিতে ‘স্থায়ী’ বলে কিছু নেই। আজ ১৯, কাল ১০, পরশু ৫০ সবই সম্ভব, যদি হোয়াইট হাউসের মুড বদলায়। আর মুড বদলানো ট্রাম্পের সবচেয়ে ধারাবাহিক নীতি।

 

 

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রশ্ন করা জরুরি আমরা কি একটি অস্থির প্রশাসনের সঙ্গে তাড়াহুড়া করে সমঝোতা করেছি? নাকি বিকল্প ছিল না বলেই মাথা নত করেছি? বাস্তবতা হয়তো মাঝামাঝি কোথাও। ৩৭ শতাংশ শুল্কের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন ছিল, তাই অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ রেখে চুক্তিতে গেছে। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক যখন আদালতে টিকল না, তখন সেই এক্সিট ক্লজই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের একমাত্র বাস্তব অস্ত্র।

 

 

ব্যঙ্গটা এখানেই যে, ট্রাম্প নিজেকে ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ ভাবেন, তাঁর সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেওয়া আদালতের রায় এখন বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যেন অজান্তেই ঢাকার জন্য একটি কূটনৈতিক উইন্ডো খুলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই জানালা দিয়ে তাকাবো, নাকি আবারও অন্ধভাবে হাততালি দেবো?

 

 

আরেকটি বিদ্রূপ এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ট্রাম্প যেদিন পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেছিলেন, সেদিন সেটিকে আমেরিকার ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ বলেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য সেই দিনটি ছিল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সূচনা। আজ আদালত সেই স্বাধীনতার ঘোষণাকে অবৈধ বলেছে। স্বাধীনতা, দেখা যাচ্ছে, কেবল বক্তৃতায় সহজ, আইনে নয়।

 

 

বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের প্রধান ভরসা, এ দোলাচলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। শুল্ক কমলে কিছুটা স্বস্তি, বাড়লে অর্ডার কমার শঙ্কা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নটা শুল্কের হার নয়; প্রশ্নটা পূর্বানুমেয়তা। ব্যবসা অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না আর ট্রাম্পীয় বাণিজ্যনীতি অনিশ্চয়তারই আরেক নাম।

 

 

এ প্রেক্ষাপটে ঢাকার করণীয় কী? প্রথমত, আবেগ নয়, হিসাব। দ্বিতীয়ত, তাড়াহুড়া নয়, কৌশল। সুপ্রিম কোর্টের রায় মানে এ নয় যে চুক্তি বাতিল করতেই হবে। মানে হলো, পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোন প্রতিশ্রুতি আমাদের জন্য ব্যয়বহুল, কোনটা অপ্রয়োজনীয়—সেগুলো নতুন করে দেখা দরকার। বিশেষ করে বড় অঙ্কের আমদানি প্রতিশ্রুতি, বিমান বা জ্বালানি কেনার মতো বিষয়গুলো ঠাণ্ডা মাথায় পর্যালোচনা করা জরুরি।

 

 

আর ট্রাম্প? তিনি হয়তো নতুন করে বলবেন, ‘আমাদের আরও বিকল্প আছে, দারুণ সব বিকল্প।’ এই বাক্যেই লুকিয়ে আছে ট্রাম্পের দর্শন। বিকল্প মানে নিয়ম ভাঙার নতুন রাস্তা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই যখন আদালত সেই রাস্তা আটকে দিচ্ছে, তখন বাইরের দেশগুলোর উচিত আরও সতর্ক হওয়া।

 

 

সবশেষে এ শুল্ক-নাটক আমাদের একটি পুরোনো সত্য মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ব বাণিজ্যে শক্তিধরদের খেলা কখনো নীতিনির্ভর হয় না, হয় স্বার্থনির্ভর। ট্রাম্প সেই স্বার্থকে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন, ঢাকার কাজ হলো সেই উচ্চারণের আড়ালের ঝুঁকি বুঝে নেওয়া।

 

 

আজ ১০ শতাংশ শুল্ক হয়তো স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু ১৫০ দিনের পর কী হবে, তা কেউ জানে না, হয়তো ট্রাম্পও না। তাই এ সময়টা উদযাপনের নয়, প্রস্তুতির। কারণ ট্রাম্পের রাজনীতিতে সবচেয়ে স্থায়ী জিনিসটি হলো অস্থিরতা। আর সেই অস্থিরতার ভেতর টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো নীতিগত দৃঢ়তা ও কৌশলগত বুদ্ধি।

 

 

 

নইলে ইতিহাস আমাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করবে যে, আমরা আদালতের রায়ে পাওয়া সুযোগকে হাততালিতে নষ্ট করেছি আর ট্রাম্পের নাটকে নীরব দর্শক হয়েই রয়ে গেছি।

লেখক: জার্মানভিত্তিক অনলাইনের হেড অব নিউজ, ঢাকা

প্রকাশিত নিবন্ধের বক্তব্য ও দায়িত্ব লেখকদের নিজস্ব