কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ভারতের কানেকটিভিটিতে বাংলাদেশের কী স্বার্থ

এস কে তৌফিক হক ও আহমদ ইফতেকার [প্রকাশ : যুগান্তর, পর্ব ১ - ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, পর্ব ২ - ১ মার্চ ২০২৬]

ভারতের কানেকটিভিটিতে বাংলাদেশের কী স্বার্থ

ভারতের বাংলাদেশ নীতির মূলে আছে ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসি। ভারতের এশিয়ামুখী কানেকটিভিটি প্রকল্পগুলো এ দুই নীতিরই ফল। মূলত তিন কারণে কখনো দ্বিপাক্ষিক, কখনো বহুপাক্ষিক পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কানেকটিভিটি প্রকল্পের অগ্রগতি সম্ভবপর হয়েছে। প্রথমত, ২০১০ সালের পর ভারতের পূর্ব এশিয়ামুখী ক্রমবর্ধমান বাজার সম্প্রসারণ ও রাষ্ট্রীয় সংহতি রক্ষার ঐকান্তিক চেষ্টা; দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ভূমিধস’ বিজয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত অনুকূল সময়ে রাজনৈতিক ‘সহযোগী’ হিসাবে আওয়ামী লীগের উত্থান এবং তৃতীয়ত, ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশে সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও কৌশলগত চিন্তার দৈন্য।

 

 

দ্বিতীয় দফায় হাসিনা শাসন শুরুর আগে, নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১০ অবধি, বাংলাদেশের জনগণ ট্রানজিট, ট্রানশিফমেন্ট বা করিডর ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে ‘রাজনৈতিকভাবে’ পরিচিত ছিলেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভারতকে ট্রানজিট বা করিডর দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক। বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, বরং ভোটের রাজনীতির কারণে, ২০০৭-এর এক-এগারোতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের ফলে এসব বিতর্ক কমে আসতে থাকে।

 

 

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা পলিসি ডোমেইনে ট্রানজিট বা করিডরের পরিবর্তে নতুন ধারণা ‘কানেকটিভিটি’ আমদানি করেন। এর মধ্যেও একাডেমিয়া থেকে কদাচিৎ কেউ কেউ, যেমন বিআইডিএসের গবেষক কেএএস মুর্শিদ (২০১১) যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভারতকে করিডর বা সংযোগ দেওয়া না দেওয়া আলোচ্য বিষয় নয়, কেন দেওয়া হবে, বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এ প্রশ্ন আরও জরুরিভাবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে।

 

 

ভারতের নীতিনির্ধারক, থিংকট্যাংক তো বটেই, বাংলাদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীও ভারতকে করিডর দিলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে প্রচার করে গবেষণা করেছেন। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন-এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এসকাপ, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি মাল্টিটোলার প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের ‘কানেকটিভিটি’ কেন দরকার সে লক্ষ্যে তথাকথিত ‘বস্তুনিষ্ঠ’ গবেষণাপত্র প্রকাশ ও সমীক্ষা চালায়। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান নানা ‘কানেকটিভিটি প্রকল্পে’ অর্থায়নও করেছে।

 

 

এমন প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালের ১০-১৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়ে নয়াদিল্লিতে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব’ ও ‘চিরাচরিত সংযোগ’ দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম নিয়ামক। প্রথমবারের মতো দুই দেশ সম্মত হয় কানেকটিভিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে। এ লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশকে রেল ও নদী ড্রেজিংয়ের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাইন অব ক্রেডিটে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়।

 

 

‘চিরাচরিত সংযোগের’ মানে কী : এ শব্দগুচ্ছের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে শুরু হওয়া ভারতীয় উপমহাদেশের জটিল রাজনীতির ইতিহাস। কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে ভারত যে বয়ান খাড়া করেছে, তা আমরা বিনা চিন্তায় মেনে নিয়েছি। আমরা প্রশ্ন করিনি, ‘চিরাচরিত’ যদি হয়েই থাকে, বর্তমানে এসব রুট সচল নেই কেন? ভারত যে কারণে এসব রুট ব্যবহার করতে চায়, আমাদের চাহিদাও কি একই রকম? আমরা কি আমাদের জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে ভারতের এ বয়ানের সঙ্গে একমত হয়েছি?

 

 

 

এটা সত্য, ঔপনিবেশিক আমলে বিস্তৃত ভারতজুড়ে উত্তরের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের বিবিধ রুট সচল ছিল। আসাম সরকার ও এডিবির এক যৌথ প্রকাশনায় (‘আসাম এজ ইন্ডিয়া’স গেটওয়ে টু আসিয়ান’, ২০২১) বলা হয়েছে, প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চল হয়ে পূর্ব-এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও বাণিজ্য একমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারত হয়ে সম্পাদিত হতো। ব্রিটিশরা ১৮৯২ সালে আসামের (দিব্রুগড়) বেঙ্গল (চট্টগ্রাম) রেলওয়ে চালু করে, যার মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সাশ্রয়ী ও সহজ সংযোগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল।

 

 

আসাম বেঙ্গল রেলের সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এসব রুট বন্ধ হয়ে যায়। এর কোনো কোনোটি আবার ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার বন্ধ করে দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ভারতের সামনে সেসব রুট পুনরুদ্ধারের সুযোগ আসে। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের বাণিজ্য চুক্তি বা সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ দ্বারা আলাদা হয়ে যাওয়া দুই অঞ্চলকে জুড়ে নেওয়ার ঐকান্তিক অভিপ্রায়। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের লাইন অফ ক্রেডিটের আওতায় ১৩ প্রকল্পের মধ্যে ১১টি রেল খাতে বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

 

অভ্যন্তরীণ নদীপথও ‘চিরাচরিত সংযোগ’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবার, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির অনুসরণে ১৯৭২ সালের ১ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রমণ ও ট্রানজিট প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এ প্রটোকলটি অদ্যাবধি চালু থাকলেও নানা কারণে তা শক্তিশালী রুট হিসাবে আবির্ভূত হয়নি। মূলত এর আওতায় বাণিজ্যিক সামগ্রীর আমদানি-রপ্তানি হলেও ২০১৭ সাল থেকে যাত্রী পরিবহণ ও পর্যটনের জন্য এ প্রটোকল সম্প্রসারিত হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর হিসাবমতে, যাত্রী পরিবহণ ও পর্যটনের জন্য দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় ২০১৯ সাল থেকে ভারতের গোহাটি থেকে কলকাতা পর্যন্ত নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু হয়। বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল বা বিবিআইএন মোটরযান চুক্তি (২০১৫) এবং চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহার চুক্তি (২০১৮) সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যও মূলত তথাকথিত চিরাচরিত সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

 

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর দুটি বইয়ে-একটি ‘ভারতীয় পথ’, India Way, অন্যটি, ‘কেন ভারত গুরুত্বপূর্ণ?’, Why India Matter-ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ‘ভারতীয় পথ’ বইয়ে জয়শঙ্কর লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির তিন দায়। একে আমরা জয়শঙ্কর থিসিস বলতে পারি। এর প্রথমটি, দেশভাগ। তিনি মনে করেন, দেশভাগের ঘটনা প্রকৃতিবিরুদ্ধ ও অস্বাভাবিক। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ দুটি দেশে ভাগের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে আহমেদাবাদের ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের এক ছাত্রসভায় তিনি এ নিয়ে কথা বলেন। দুই. বিলম্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারত শীতল যুদ্ধের দীর্ঘছায়া থেকে মুক্ত হয়ে যে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেছিল, তা দেরি করে শুরু করেছিল। অন্তত চীনের এক দশক পরে বলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফসোস করেছেন। তিন. পারমাণবিক গবেষণায় ভারতের আগের সরকারগুলোর ছিল দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়সারা মনোভাব। অনেক আগেই ভারত পরমাণু গবেষণা বা সক্ষমতা অর্জন করতে পারত; কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিবিদদের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অভাবে এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রলম্বিত হয়।

 

 

 

জয়শঙ্করের থিসিস অনুসারে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির তিন দায় মেটানোই ভারত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ। সুতরাং, এ উদ্দেশ্যেই সব সম্পদের ব্যবহার হবে, এটাই স্বাভাবিক। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি এ উদ্দেশ্যর সঙ্গে অভিযোজনের নিরন্তন প্রচেষ্টা। ভারতের ভাষ্যমতে, দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কই ভারতের বাংলাদেশ নীতির মূল ফ্রেমিং। সে তুলনায় গত ১৭ বছরের বাংলাদেশের ভারত নীতি লক্ষ্যহীন ও জনস্বার্থবিরোধী। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে রোল মডেল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের এমন ‘রোল মডেল’ সম্পর্কে বাংলাদেশের স্বার্থ কী ছিল, তার আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

 

 

হাসিনা আমলে বাংলাদেশের অবস্থান কী ছিল : ২০১০ সালের পর থেকে ভারতের সঙ্গে ‘চিরাচরিত’ যোগাযোগের রুটগুলো আবারও চালু করার লক্ষ্যে ‘কানেকটিভিটি প্রকল্পে’ বাংলাদেশ স্বতঃস্ফূর্ত ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করেছে। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এক নিবন্ধে (২০২৩) বাংলাদেশের সহায়ক ভূমিকাকে ‘নতুন দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। সে মোতাবেক কানেকটিভিটির মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে আরও সংযুক্ত হবে। এ ধরনের চিন্তায় সহজ অনুমান হলো, কানেকটিভিটির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবার মাধ্যমে যুক্ত হবে এবং এতে দুই দেশের জনগণ উপকৃত হবে।

 

 

অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা যুক্তি দিয়েছেন, কানেকটিভিটি বাংলাদেশ, ভারত উভয়ের জন্যই উইন-উইন হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর অন্যতম। শুধু তাই নয়, নর্থ ইস্ট এশিয়ামুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্যই প্রবেশদ্বার। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিলেন, দুই দেশের তো বটেই, এর বাইরেও আসিয়ান ও বিমসটেকের সদস্য হিসাবে পূর্বমুখী সংযোগ বাড়িয়ে বাংলাদেশ বৃহত্তর স্বার্থও হাসিল করবে। মোট কথা, দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে যোগাযোগ প্রকল্প অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনয়নে সক্ষম হবে। এ উপাঞ্চল আসিয়ান বা নাফটার মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়ে পরিণত হবে।

 

 

কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই ২০১০ সালের পর বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাজার সম্প্রসারণ করার নীতি প্রণয়ন করে। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ব্যতীত বা কোনো সমীক্ষা দ্বারা সমর্থিত নয় বিধায় রপ্তানি নীতি কাগুজে হয়েছিল। সরকারও বাংলাদেশের স্বার্থে এ অঞ্চল নিয়ে পূর্বাপর পরিকল্পনা ও কাঠামোগত পরিবর্তন করেনি। ব্যবসায়ী বা জনগণের প্রবেশ যেহেতু নীতি প্রণয়নে সীমিত বা নেই বললেই চলে, তাই উত্তর-পূর্ব ভারতে আমাদের যেসব ব্যবসায়িক স্বার্থ ও বিনিয়োগের বাধা তৈরি হয়েছে, তার কোনো সুরাহা হয়নি।

 

 

এমনকি আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সংযুক্ত হওয়ার কোনো সময়াবদ্ধ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আমরা লক্ষ করিনি। অন্য আরেকটি দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করেও এটি স্পষ্ট হয়। ভারত যত দ্রুততার সঙ্গে আসিয়ানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে রপ্তানি গন্তব্য ডাইভারসিভাই করে বিশ্ব বাণিজ্য ঝুঁকি কাটাতে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশ ততটুকু ঝুঁকিগ্রস্ত হয়েছে।

 

 

২০১৬-১৭ অর্থবছর ছাড়া (সে বছর আমাদের রপ্তানি ছিল ২.২৫ বিলিয়ন) আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বিগত ১০ বছরে ২ বিলিয়নও পৌঁছায়নি (সূত্র : ইপিবি)। পক্ষান্তরে ২০১৪ সালে আসিয়ান দেশগুলোতে ভারতের বাণিজ্য ছিল ৩৩.৮১ বিলিয়ন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বিগত এক দশকে (২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের হিসাবে) প্রতিবছর ভারতের বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 

 

দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতকে উৎসাহিত করতে বিদ্যমান আইনি কাঠামো আরও সহজ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ২০১০ সালে ভারতের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০১৭ সালে জয়েন্ট ইন্টারপ্রেটিভ নোটের মাধ্যমে বিনিয়োগ চুক্তি হালনাগাদ ও পরিমার্জন করেছে; কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ভারতের পথচলা ছিল একেবারেই বিপরীত। মাত্র ৩ বছরের মাথায়, ২০২০ সালে গৃহীত বিদেশি বিনিয়োগ নীতি ভারতের প্রতিবেশীদের (নেপাল ও ভুটান বাদ) যে কোনো বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করে (দেখুন ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ ২০২৪ সালে সরকারি ক্রয় নীতিমালায়ও একইভাবে প্রতিবেশী যে কোনো দেশের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। দিন দিন বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করতে ভারত অশুল্ক বাধা আরোপ করেছে।

 

 

বাংলাদেশের জন্য কানেকটিভিটিতে যুক্ত হওয়া অনেক বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে একটা হিসাব বারবার আমাদের সামনে আসবে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যের হিস্যা কত? এশিয়ার সঙ্গে, বিশেষ করে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হিস্যা কি বৃদ্ধি পেয়েছে? এ নিয়ে কি বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে? সংযোগ প্রকল্পের পর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবার পরিমাণ কি বৃদ্ধি পেয়েছে? এসব প্রশ্ন কানেকটিভিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।

 

 

 

পর্ব ২

 

বাংলাদেশে জোর প্রচার আছে, একতরফা সম্পর্কের ভিত্তিতে যে কানেক্টিভিটি রচিত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ একেবারেই গৌণ ছিল। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের পর থেকে এ ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। কানেক্টিভিটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি প্রকাশ পেলে হয়তো এ বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক তৈরি হতো, তা হয়নি। তদুপরি, একটা প্রশ্ন বারবার সামনে চলে আসে, বাংলাদেশের কি কোনো প্রস্তুতি ছিল? রিজিওনাল কানেক্টিভিটি ভারতের উত্তর-পূর্বাংশে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে কি আদৌ কোনো সহায়ক ভূমিকা রেখেছে? বাংলাদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ কোন অর্থে বৃদ্ধি পেয়েছে? বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগই সম্পন্ন হয়ে থাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। এখানে আসিয়ান বা বিমসটেকের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির কোনো যথাযথ উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি।

 

 

কানেক্টিভিটি নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা বুঝতে ভারত-মিয়ানমারের বাণিজ্য হিসাব ভালো রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। আসিয়ানের ১০টি দেশের মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের কানেক্টিভিটি বেশি হলেও বাণিজ্য সবচেয়ে কম (আসিয়ানের ১০ দেশে সপ্তম অবস্থানে)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত-মিয়ানমার বাণিজ্য হয়েছে ০.৬৭ বিলিয়ন (সূত্র : বিদেশ মন্ত্রণালয়, ভারত)। এর মানে কানেক্টিভিটি থাকলেই বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবার পরিমাণ বাড়বে-এ সমীকরণ এত সহজ নয়। কিন্তু বিদ্যমান স্বৈরাচারী সামরিক শাসনকে সয়ে নেওয়া, আরাকানের গণহত্যায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে অদৃশ্য প্রভাব বজায় রাখার আন্তর্জাতিক রাজনীতির কুটিল শিক্ষাগুলো ভারত মুনশিয়ানার সঙ্গেই করছে।

 

 

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল নিয়ে গঠিত উপাঞ্চলের মধ্যে যে কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে সব দেশ সমভাবে সাড়া দেয়নি। আন্তর্জাতিক ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনের অংশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিরন্তর সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে ভারতের আঞ্চলিক হেজিমনি এবং ভারতের প্রতি এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সন্দেহ ও আশঙ্কা সমানুপাতিক হারে বেড়েছে। প্রশ্ন রয়েছে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশ হিসাবে ভারত কানেক্টিভিটিতে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য কতটুকু ছাড় দিয়েছে?

 

 

ভারতের ‘নেইবারহুড পলিসি’ কি তাহলে প্রতিবেশীর ওপর নিজের খোদকারি জাহিরের ভিন্ন নামীয় কর্মসূচি। কানেক্টিভিটিকে ঘিরে এসব বিতর্ক এখনো শুকিয়ে যায়নি। আমাদের দেশেই নয়, অন্যান্য প্রতিবেশীর মধ্যেও রয়েছে। যেমন-ভুটান বিবিআইএন চুক্তি এখনো র‌্যাটিফাই করেনি। ভারতের ব্যবসায়িক আকার ও সক্ষমতা তথা ভারতীয় ব্যবসার বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একচ্ছত্রতা প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন আশঙ্কায় ভুটানি ব্যবসায়ীরা এ চুক্তিতে ভেটো দেন।

 

 

ভারত কেন ‘কানেক্টিভিটি প্রকল্প’ চাইছে : ভারতের কানেক্টিভিটি দুই কারণে প্রয়োজন। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সংহতি দৃঢ়করণ। প্রখ্যাত ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অবিনাশ পালওয়াল তার প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া’স নিয়ার ইস্ট’ (২০২৩) বইয়ে বলেছেন কীভাবে গত তিন দশকে ভারত পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি এসেছে। এবং এর মূলে ছিল ভারতের সংহতি রক্ষার ঐকান্তিক তাগিদ।

 

 

মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ব্রিটিশ আমলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এক্সটার্নাল ফ্রন্টিয়ার হিসাবে পরিচিত ছিল। উপমহাদেশের রাজনীতির পালাবদলের ফলে এ দুর্গমতা বেড়েছে বৈ কমেনি। একসময় শত্রু দেশ পাকিস্তান, এরপর বাংলাদেশ আমলেও কোনোভাবেই এ অঞ্চলের সীমান্তবর্তিতা কমেনি। বাংলাদেশের কারণে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ বেশ কষ্টসাধ্য, দুরূহ ও প্রায় বিচ্ছিন্ন। একাংশের সঙ্গে অন্য অংশের যোগাযোগের একমাত্র পথ ২৭ কিলোমিটারের শিলিগুড়ি করিডর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত।

 

 

 

ভারতের ৫ রাজ্যের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। বাংলাদেশ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শহরের দূরত্ব গড়ে ২০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মাঝামাঝি। উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে ‘চিরাচরিত’ রুটে যোগাযোগ স্থাপিত হলে একদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার যেমন সম্ভব হবে, অন্যদিকে সেখানে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে। এভাবে উন্নয়ন হলে ভারতের এ অঞ্চলে বিদ্রোহ ও দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি দূর হবে।

 

 

দ্বিতীয়ত, কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ভারতের অর্থনীতির সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। নিরেট অর্থনৈতিক হিসাব কষে প্রবীর দে ও মানব মজুমদার ভারতীয় থিংক ট্যাংক আরআইএসের গবেষণায় (২০১৪) দেখিয়েছেন, ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ শতাংশ এ অঞ্চলে বাস করে (২০১১ সালের সেন্সাস)। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ অঞ্চল ভারতের অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় অদ্বিতীয়।

 

 

উন্নয়নের এসব শর্ত থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ দুঃসাধ্য। তাদের মতে, দেশভাগের আগে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের যেভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছিল, এখন তা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। এ অঞ্চল পশ্চাৎপদতার দিকে ধাবিত হয়েছে। আয়-বৈষম্য এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অন্যান্য সূচকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতের অন্যান্য এলাকা থেকে বেশ পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর (প্রবীর দে ২০১৪)। সুতরাং, সব বিবেচনায় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কানেক্টিভিটি বা সংযোগ লাভজনক। একই যুক্তির অনুরণন পাই, শিলংস্থ ভারতের থিংক ট্যাংক এশিয়ান কনফ্লুয়েন্সের নানা গবেষণাপত্রে। বাংলাদেশের থিংক ট্যাংক সানেমও এর কোনো কোনোটি যৌথভাবে গবেষণা করেছে। এসব যুক্তির মোদ্দা কথা হলো, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে পরস্পর লাভবান হতে চাইলে কানেক্টিভিটি দরকার।

 

 

 

কানেক্টিভিটিতে বিনিয়োগ : কীভাবে বাংলাদেশ ভারতের কানেক্টিভিটিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তা বোঝার জন্য আমরা রেলওয়ে খাতকে উপযুক্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করি। ২০১০ সালের যৌথ বিবৃতিতে আমরা দেখি, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির জন্য ভারত বিনিয়োগের খাত হিসাবে রেলওয়েকে বাছাই করে। ২০১০ সালে ভারতের এলওসির মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রদত্ত ৮৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয়েছে এ খাতে। এ অর্থে ১৫ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র একটি বাদে সব প্রকল্পই রেলওয়ের ‘আধুনিকীকরণ’ ও ‘সক্ষমতা’ বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হয়। উল্লেখ্য, শর্ত মোতাবেক লাইন অফ ক্রেডিট বা এলওসির ৭৫ শতাংশ অর্থ ভারতীয় পণ্য ও সেবা ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতে হবে।

 

 

 

গত পনের বছরে রেলওয়ে ট্র্যাকের উন্নয়ন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, মেরামত সক্ষমতার মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ে ভারতনির্ভর হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘আধুনিকীকরণ’ ও ‘সক্ষমতা’ বৃদ্ধি এখন প্রায় ভারতনির্ভর পুরোটাই। রাইটস, ইরকন ইত্যাদি ভারতীয় রেলওয়ের রপ্তানিমুখী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নতিকল্পে কাজ করে। যেহেতু বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগ ও সরকারি ক্রয়ে ভারতকে উন্মুক্তভাবে সুযোগ প্রদান করা হয়েছে, তাই লাইন অফ ক্রেডিটের বাইরেও ভারতীয় রেলশিল্পের ওপর নিভর্রতা গত পনের বছরে বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ভারত থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ১১১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ২০০ ব্রডগেজ কোচ কিনেছে।

 

 

একই কথা খাটে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথ পুনরুদ্ধার ও সচল করার প্রজেক্টেও। বাংলাদেশ ঋণ করে এসব নৌরুট চালু করলেও এর কৌশলগত ব্যবহার ভারতের নানা শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 

 

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাণিজ্যিক অশুল্ক বাধা আরোপ : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অন্তত তিনটি অশুল্ক বাধা আরোপ করেছে। প্রথমটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে কোনো ধরনের আগাম বার্তা ছাড়াই ভারত একতরফাভাবে দিল্লি ও কলকাতার এয়ার কার্গো সুবিধা বন্ধ করে। এ বন্দোবস্তের আওতায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা দিল্লি বিমানবন্দরে কিছু কার্গো সুবিধা পেতেন। বাংলাদেশ থেকে কার্গো চার্জ ও অন্যান্য সুবিধা কম হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় যাদের রপ্তানি ছিল, তারা এ সুবিধা গ্রহণ করতেন। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের রপ্তানি বাণিজ্যকেন্দ্রিক প্রস্তুতি প্রায় শূন্য ছিল। ফলে এপ্রিলে ভারতের সুবিধা বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রপ্তানিকারকদের মাঝে হতাশা নেমে আসে।

 

 

 

বাণিজ্য কেবল আর্থিক বিষয় নয়, কৌশলগতও বটে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য মূলত সম্পাদিত হতো স্থলপথে। মূলত বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে। ২০২৫ সালে ভারত বাংলাদেশের বেনাপোল ও অন্যান্য স্থলবন্দর হয়ে রপ্তানি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে কয়েকটি উদীয়মান খাত হলো, কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য, ফার্নিচার ও প্লাস্টিকজাত পণ্য। বাংলাদেশের পাটের অন্যতম বৃহৎ বাজার ভারতের কলকাতাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের উন্নত জাতের পাটের এ বাজার ঐতিহাসিক। ২০২৫ সালের জুন থেকে কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য বেনাপোল হয়ে প্রবেশ করতে পারছে না। ভারতের ব্যবসায়ীরা মুম্বাই হয়ে এ পণ্য আমদানি করতে পারবেন। একই কথা ফার্নিচার ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের বেলায়ও খাটে। আমদানিকারকরা এসব পণ্য বাংলাদেশ থেকে আনতে চাইলে এখন মুম্বাই হয়ে আনতে হবে।

 

 

 

এখানেই শেষ নয়, নিজের উচ্চাভিলাষী শিল্পনীতি বাস্তবায়নে (২০৩০-এ ভারতের বাণিজ্য লক্ষ্য ১ ট্রিলিয়ন উন্নীতকরণ) ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাধীন নানা বাণিজ্য প্রতিকার বা ট্রেড মেজার’স (যেমন কাউন্টার ভেলিং ও অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যারিফ) গ্রহণ করেছে। দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানিভিত্তিকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের পাটকে টার্গেটে পরিণত করেছে। অবশ্য ২০১৫ সাল থেকেই ক্রমাগত বাংলাদেশের এ পণ্যকে ভারত আমদানি বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছে। ৫ আগস্টের পর এ চেষ্টা আরও বেগবান হয়েছে।

 

 

এর সঙ্গে ২০২০ সালে গৃহীত বিদেশি বিনিয়োগ নীতি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে সরকারি ক্রয় নীতিমালা একসঙ্গে পাঠ করলে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নষ্ট করতে ভারত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব নীতি গ্রহণ করেছে। উদগ্রভাবে কেবল ভারতীয় শিল্পের বিকাশ ও তাদের স্বার্থরক্ষাই ভারতের একমাত্র অভীষ্ট। এমনকি ২০১০ সালের পর সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক সব বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি, কোনো কিছুরই তারা তোয়াক্কা করেনি।

 

 

৫ আগস্টের পর ভারতের নীতিনির্ধারকদের অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ আশঙ্কার পেছনে রেসিপ্রোসিটির প্রশ্ন প্রথমে আসে, ভারত নিজে সব ধরনের বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবেশে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং করছে, তাহলে বাংলাদেশ কী করবে? বাস্তবে তা হয়নি, বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ মন্থর হলেও উঠে যায়নি। কোনো কোনো খাতে বরং এখনো শক্তভাবেই টিকে আছে (বিস্তারিত দেখুন, বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েবসাইট)।

 

 

কানেক্টিভির ভবিষ্যৎ কী : কানেক্টিভিটি নিয়ে বাংলাদেশের কোনো সুস্পষ্ট নীতি ছিল না এবং বর্তমানেও নেই। হাসিনা আমলে যা ছিল সব কাজে বিনাবিচারে সদর্থক, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা বাছবিচার ছাড়া নীরব থাকা। এমন প্রেক্ষাপটে বিশালাকার কানেক্টিভিটি আর্কিটেকচারের (চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, নতুন আইন, প্রজ্ঞাপন, প্রকল্প ও প্রশাসনিক পরিবর্তন) ভবিষ্যৎ কী? আমরা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়েছি। ভারত যখন একতরফাভাবে একের পর এক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, তখন আমাদের করণীয় কী, তা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি।

 

 

 

এ পরিস্থিতি আর দীর্ঘায়িত হওয়া সমীচীন নয়। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে কানেক্টিভিটি প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করবে এবং সে আলোকে একটি সংশোধিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করবে। কিন্তু যদি পুরোনো বাস্তবতাকে আড়াল করে নতুন নাম ও নতুন মোড়কে আবারও ভারতকে কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে অসম সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এর বিরোধিতায় সোচ্চার হয়ে উঠতে পারে।

 

 

 

এস কে তৌফিক হক : প্রফেসর ও ডিরেক্টর, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়