ভেনেজুয়েলা সংকটের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব
মো. সোহেল রানা, প্রযুক্তিবিদ, যুক্তরাষ্ট্র [প্রকাশ : সময়ের আলো , ৫ জানুয়ারি, ২০২৬]

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্ময়, বিতর্ক ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কেন এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক খবর বা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রকাশ্যে এই অভিযানের পেছনে মাদক পাচার, সংঘটিত অপরাধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে।
রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই সরকারি অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। নিঃসন্দেহে মাদক পাচার ও অপরাধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। তবে প্রশ্ন থেকেই যায় এই কারণগুলোই কি একমাত্র চালিকাশক্তি, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কৌশলগত বাস্তবতা রয়েছে?
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি কেবল আইন প্রয়োগ বা নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। দ্য গার্ডিয়ান, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এবং দ্য ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলো ইঙ্গিত দেয়, এই ঘটনাটি বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ।
আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার কেন্দ্র এখন শুধু ভূখণ্ড বা প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই সম্পদ কীভাবে পরিবহন হয়, কোন মুদ্রায় লেনদেন হয়, কে বীমা দেয় এবং কে আর্থিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এই পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারই মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তেল বাণিজ্যসহ আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশ এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে চীন ধীরে ধীরে এই কাঠামোর বিকল্প গড়ে তোলার কৌশল গ্রহণ করেছে।
সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে তারা অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বিস্তারের পথ বেছে নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, ঋণের বিনিময়ে তেল সরবরাহ, বিকল্প শিপিং নেটওয়ার্ক এবং ডলারবিহীন লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে।
চীনের এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণভিত্তিক প্রভাব বিস্তার। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বড় অঙ্কের ঋণ ও অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে কিছু দেশকে একটি নির্ভরশীল অর্থনৈতিক চক্রে নিয়ে আসে। শুরুতে সহজশর্তে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ দেওয়া হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ে।
যখন কোনো দেশ সেই চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কৌশলগত সম্পদ, বন্দর, জ্বালানি সরবরাহ বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করা হয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই মডেলের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।
ইরান ও ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে এই দেশগুলো যখন বৈশ্বিক বাজার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন চীন তাদের জন্য বিকল্প অর্থনৈতিক পথ খুলে দেয়। এতে স্বল্পমেয়াদে তারা কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তি পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত নির্ভরতার দিকে এগিয়ে যায়। এই নির্ভরতা শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের একটি প্রতীকী ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এমন একটি প্রবণতার অংশ, যা ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় তাদের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ফলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পদক্ষেপকে তেলক্ষেত্র দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, বরং তেল পরিবহন, অর্থপ্রদান, বীমা ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে দেখা উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বক্তব্য ও ইঙ্গিত থেকে আরও বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের অবস্থান আপাতত কঠোরই থাকছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য হিসেবে বলা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত চাপ অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় ধাপের বা পুনরায় আক্রমণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। যদিও এসব বক্তব্যের বাস্তবায়ন কতটা এবং কোন মাত্রায় হবে, তা এখনও অনিশ্চিত, তবু এই ধরনের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে।
ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই এই সংকটের পরিণতি অনেকটাই নির্ভর করবে। যদি উভয় পক্ষ উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পথে এগোয়, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিপরীতে যদি শক্তি প্রদর্শন ও চাপের রাজনীতি অব্যাহত থাকে, তা হলে আঞ্চলিক অস্থিরতা, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে যার প্রভাব শুধু ভেনেজুয়েলায় নয়, পুরো লাতিন আমেরিকা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার ঘটনা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আধুনিক ভূরাজনীতিতে সংঘাতের চরিত্র বদলে গেছে। আজ যুদ্ধ মানেই শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়; বরং অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থার নিয়ম লেখার ক্ষমতাই হয়ে উঠেছে মূল লড়াইয়ের ক্ষেত্র। এই বাস্তবতা অনুধাবন না করলে আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত অর্থ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ বোঝা কঠিন হয়ে পড়বে।