কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ধোঁয়াশা: সবার টার্গেট হরমুজ প্রণালী

[সূত্র : খবরের কাগজ, ১৯ এপ্রিল ২০২৬]

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ধোঁয়াশা: সবার টার্গেট হরমুজ প্রণালী

হরমুজ প্রণালীর ওপর আবারও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটি নাবিকদের সতর্ক করেছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ আবার বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে শিপিং সূত্র জানায়, অন্তত দুটি জাহাজ এই প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করার সময় গুলির মুখে পড়েছে।

 

 

তেহরান দাবি করে, তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত নৌ-অবরোধের প্রতিক্রিয়ায়, যাকে তারা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলছে। 

 

নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানের নৌবাহিনী শত্রুদের ওপর ‘নতুন তিক্ত পরাজয়’ চাপিয়ে দিতে প্রস্তুত।

 

ইরানের এই কঠোর অবস্থান আবারও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে এবং আশঙ্কা তৈরি করেছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্নিত থাকতে পারে। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন এখনো ভাবছে এই নাজুক যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বৃদ্ধি করা হবে কি না।

 

 

নৌ-নিরাপত্তা ও শিপিং সূত্র জানায়, কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের নৌবাহিনীর কাছ থেকে রেডিও বার্তা পেয়েছে। সে বার্তায় বলা হয়েছে, কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। ফলে দিনের শুরুতে যে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে চলাচল আবার শুরু হতে পারে, তা উল্টে যায়।

 

 

অন্তত দুটি জাহাজ প্রণালী পার হওয়ার সময় গুলিবর্ষণের শিকার হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

 

 

এর আগে সামুদ্রিক ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা যায়, আটটি তেলবাহী জাহাজের একটি বহর সংকীর্ণ ওই পথ অতিক্রম করছে। বিষয়টি ছিল সাত সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর প্রথম বড় ধরনের চলাচল।

 

 

‘ভালো খবর আছে’
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি বুধবার শেষ হওয়ার কথা। এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে ‘কিছু ভালো খবর’ থাকার কথা বললেও বিস্তারিত বলেননি। 

 

 

তবে তিনি সতর্ক করেন, বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হলে যদি কোনো শান্তিচুক্তি না হয়, তাহলে আবার লড়াই শুরু হতে পারে।

 

 

এর আগে ইরান, ইসরায়েল-লেবাননের ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সঙ্গে জড়ালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় অভিযান চালায়।

 

 

কিন্তু শনিবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড জানায়, প্রণালীটি আবার কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘বারবার লঙ্ঘন’ এবং অবরোধের আড়ালে ‘জলদস্যুতা’র অভিযোগ তোলে।

 

 

একজন মুখপাত্র বলেন, আগে আলোচনা শেষে সীমিতসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ‘সৎ উদ্দেশ্যে’, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড তাদের আবার কঠোর নিয়ন্ত্রণে ফিরতে বাধ্য করেছে।

 

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ কার্যকর করছে। তবে ইরানের সর্বশেষ পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করেনি।

 

 

সরাসরি আলোচনা অনিশ্চিত
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এরই মধ্যে হাজারও মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যায়।

 

 

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদে বলেন, পরবর্তী দফার আলোচনার কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। আগে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি করতে হবে।

 

 

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙেছে, তাই ‘এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে।’ 

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। কারণ নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি এবং জনপ্রিয়তা হ্রাস নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাপে রয়েছেন।

 

 

গত শুক্রবার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইরান নিয়ে বিষয়গুলো ভালোই এগোচ্ছে। আমরা সপ্তাহান্তে আলোচনা করছি… অনেক বিষয় আগেই ঠিক হয়েছে।’ 

 

 

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। এটিই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।’

 

 

তবে একই সঙ্গে তিনি আবারও হুঁশিয়ারি দেন, বুধবারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতি শেষ করে দেওয়া হতে পারে এবং ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ চলবে। 

 

 

ট্রাম্প রয়টার্সকে জানান, এই সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে কূটনীতিকরা মনে করছেন, ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজন করা কঠিন হওয়ায় তা অনিশ্চিত।

 

 

গতকাল সকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনার প্রস্তুতির তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। গত সপ্তাহান্তে সেখানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হলেও কোনো চুক্তি হয়নি।

 

 

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে তিন দিনের বৈঠক শেষ করেছেন বলে দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরছেন।

 

 

একটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক হতে পারে, এরপর ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি সম্ভব।

 

 

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা
শান্তি আলোচনায় বড় বাধা হয়ে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান এটিকে বেসামরিক জ্বালানি প্রকল্প বলে দাবি করে।

 

 

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে নিতে চায়। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেন, এই উপাদান কোথাও সরানো হবে না। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, তারা আশা করছেন শিগগিরই একটি প্রাথমিক চুক্তি হবে।

 

 

শুক্রবার ইরানের ঘোষণার পর তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ কমে এবং বিশ্ব শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যায়। কারণ ধারণা করা হচ্ছিল, আবার জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।

 

 

তবুও শিপিং সূত্র জানায়, এখনো শত শত জাহাজ এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক উপসাগরে আটক রয়েছেন, যারা এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। গত সপ্তাহের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেয়, আর ইরান ৩ থেকে ৫ বছরের বিরতির কথা বলে। দুটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, এমন একটি সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যাতে ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। সূত্র: রয়টার্স