কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী

ব্রি. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব) [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ]

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী

 


বিশ্ব রাজনীতি আবারও এক অস্থির বাঁকে দাঁড়িয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শত্রুতা এখন নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা উসকে দিচ্ছে। এটি শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বিশেষভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মতো আমদানিনির্ভর অঞ্চলে। প্রশ্নটি তাই শুধু ‘যুদ্ধ হবে কি না’ তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনা কতটা গভীর ও কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং বাংলাদেশ এর জন্য কতটা প্রস্তুত।

 

 

কেন আবার উত্তেজনা বাড়ছে : যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের শিকড় বহু পুরনো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি কারণ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ কীপ্রথমত, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা। নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

 

 

ইতিহাস বলে, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সময়ে রাষ্ট্র প্রায়ই বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়ার চেষ্টা করে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, ইরান ধীরে ধীরে এমন এক সীমায় পৌঁছাচ্ছে, যেখান থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন কঠিন হবে না। অন্যদিকে ইরান এটিকে সার্বভৌম অধিকার হিসেবে তুলে ধরে।

 

 

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য। ইসরায়েল ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে তার কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ মনে করে। এই ত্রিভুজ সম্পর্ক উত্তেজনাকে স্থায়ী করে রেখেছে।

 

 

কী ধরনের সংঘাত হতে পারে : পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না সীমিত আঘাত? বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, নিকট ভবিষ্যতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে সীমিত সামরিক সংঘাত, অর্থাৎ ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ, নির্দিষ্ট স্থাপনায় বিমান হামলা বা প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে আঘাত—এগুলো খুবই বাস্তবসম্ভব।

 

 

আরেকটি বড় ঝুঁকির জায়গা হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখানে সামান্য অস্থিরতাও তেলের দামে বড় ধাক্কা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও ইরান এই প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করলে বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যপট হলো, পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে সরাসরি বড় আকারের হামলা ও পাল্টা হামলা। এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

 

দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব : দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে হলেও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত কাছাকাছি।

 

 

জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি : বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং সেচব্যবস্থা বড় অংশে আমদানীকৃত তেল ও গ্যাসনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেই বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচও বৃদ্ধি পায়। এর ফল হিসেবে চাল, সবজি, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশের মতো উচ্চ জনসংখ্যা ও সীমিত আয়ের দেশে এই মূল্যস্ফীতি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চাপে ফেলে।

 

 

শিপিং ও বাণিজ্য : হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক শিপিং কম্পানিগুলো অতিরিক্ত বীমা প্রিমিয়াম আরোপ করে এবং ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ বিকল্প রুটে যেতে বাধ্য হয়, এতে সময় ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, সার, জ্বালানি তেল, কয়লা, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্য পণ্যের আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়া। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে চলে আসে এবং বাজারদর আরো চাপে পড়ে।

 

 

রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য। যুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনায় যদি এসব অর্থনীতিতে মন্দার কারণ হয় বা ভোক্তার চাহিদা কমে যায়, তাহলে নতুন অর্ডার স্থগিত বা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সময়ে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় আমদানির জন্য বেশি ডলার ব্যয় করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে। এর ফলে বিনিময় হার অস্থির হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

 

 

প্রবাস আয় : মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নির্মাণ, সেবা ও জ্বালানি খাতে যুক্ত। আঞ্চলিক সংঘাত বাড়লে নতুন প্রকল্প স্থগিত হতে পারে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত কারণে কর্মী প্রত্যাবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহে সামান্য হ্রাসও বাংলাদেশের মতো দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ভোগ ব্যয় ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই চারটি খাত মিলেই বোঝায় মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী কোনো সংঘাতও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত ও বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম।

 

 

বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য : বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। এই সময়ে বৈশ্বিক কোনো বড় ধাক্কা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, জ্বালানি ও আমদানিনির্ভরতা। পাশাপাশি শক্তির রাজনীতিতে সরাসরি কোনো ভূমিকা না থাকলেও, এর প্রভাব এড়ানোর সুযোগও সীমিত। ফলে এখানে কূটনৈতিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

বাংলাদেশের করণীয় কী

 

১. জ্বালানি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কৌশলগত ইস্যু। দীর্ঘমেয়াদি তেল ও এলএনজি সরবরাহ চুক্তি থাকলে হঠাৎ দামের ঝাঁকুনি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। একই সঙ্গে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ালে সংকটকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

 

২. বাণিজ্য ও শিপিং প্রস্তুতি : আন্তর্জাতিক জলপথে ঝুঁকি বাড়লে বিকল্প রুট ব্যবহারের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিপিং বীমা কভারেজ আগাম নিশ্চিত করা এবং বড় আমদানিকারকদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করলে আকস্মিক ব্যয় বৃদ্ধি সামাল দেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি বন্দরগুলোর দক্ষতা ও ধারণক্ষমতা বাড়ালে জাহাজ জট ও দেরি কমবে, যা সংকটকালে সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখতে সহায়ক।

 

 

৩. মুদ্রানীতি ও বাজার নজরদারি : সংঘাতকালীন সময়ে ডলারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা এবং জরুরি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুদদারি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি না থাকলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

 

 

৪. কূটনৈতিক ভারসাম্য : বাংলাদেশের শক্তি হলো, তার নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং অন্যান্য বড় শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত। কোনো এক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে, তাই জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সমান দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়।

 

 

৫. প্রবাসী সুরক্ষা : মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। সংঘাত বা অস্থিরতার সময়ে তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং জরুরি প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি হালনাগাদ রাখা জরুরি। দূতাবাস ও কনস্যুলার সেবাকে আরো সক্রিয় করলে প্রবাসীদের আস্থা বাড়বে এবং সংকটকালে দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

 

 

এই পদক্ষেপগুলো আগাম গ্রহণ করা গেলে বৈশ্বিক সংঘাতের ধাক্কা বাংলাদেশ অনেক বেশি স্থিতিশীলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত হয়তো আজই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না, কিন্তু এর ছায়া এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ এই সংঘাতের সরাসরি অংশ না হলেও এই পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক মূল্য দিতে বাধ্য হতে পারে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, প্রস্তুতি ও ভারসাম্য। আগাম পরিকল্পনা, বিচক্ষণ কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক ঝড়ের ধাক্কা অনেকটাই সামাল দিতে পারবে। না পারলে দূরের এক যুদ্ধের আগুন আমাদের ঘরেই এসে লাগতে পারে মূল্যস্ফীতি, সংকট ও অনিশ্চয়তার রূপ নিয়ে। এখনই সময় সতর্ক হওয়ার, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকার।

 

 

লেখক : গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক