কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত

সরকার পরির্বতন নাকি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ৩ মার্চ ২০২৬]

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা চালায়। ইসরাইল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে এবং হুমকি দূর করতে ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে আগাম প্রতিশোধমূলক এ হামলা শুরু করেছে বলে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই কয়েক মাস ধরে এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

 

ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে এক সংঘাতের মধ্যে পতিত হচ্ছে। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুল রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ঘস্থানীয় নেতা ও কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকি দূর করবে এই হামলা। ইরানিদের জন্য তাদের শাসক উৎখাতের সুযোগও তৈরি করবে। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এ হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

 

 

ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক আলোচনায় নমনীয় করতে এ অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘ব্যাপক ও চলমান’ অভিযান শুরু করেছে বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন। পারমাণবিক অস্ত্র যাতে কোনোভাবেই ইরান তৈরি করতে না পারে, এমন নিশ্চয়তার অঙ্গীকার করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের নতুন এ সংঘাত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সমাধানের প্রত্যাশাকে ক্ষীণ করেছে। আলোচনার পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করেন ট্রাম্প। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিও প্রদান করেন ট্রাম্প। ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি নির্মূল করে মার্কিন নাগরিকদের রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য।

 

 

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানি জনগণকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরানের সকল স্তরের মানুষের জন্য সময় এসেছে, স্বৈরশাসনের জোয়াল ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার এবং একটি শুক্ত ও শান্তিকামী ইরান গড়ে তোলার। তবে এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা শুরু করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।

 

 

শুধু পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যে কোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে বলে নেতানিয়াহু সরকার দাবি করে আসছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপরও বিধিনিষেধ আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল ইসরাইল। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে ইরান আলোচনা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে ইরান রাজি হয়নি।   

 


ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দাবি করে আসছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। কারণ তারা মনে করেন, এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। যে কোনো হামলার বিরুদ্ধে ইরান নিজেদের রক্ষা করবে বলে জানিয়েছিল। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকেও তারা সতর্ক করেছিল যে, যেসকল রাষ্ট্রে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতেও পাল্টা আঘাত হানবে তারা। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর পর প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে।

 

 

 এতে করে সমগ্র অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী হামলার মুখে পড়েছে। তারা এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘ট্রুথফুল প্রমিজ ৪’। এ অভিযান শত্রুকে স্থায়ীভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থাপনা ও স্বার্থকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে ইরানের সেনাবাহিনী গণ্য হবে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। তাদের ভূখণ্ডে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাষ্ট্রগুলো। ইরান ও এ অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে ওমান। সাম্প্রতিক সময়েও রাষ্ট্র্রটি ওমানে এবং জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় ভূমিকা রেখেছিল।

 


গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। অবশ্য এই সংকটের জন্য রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা দায়ী। জাতিগত বিভাজন বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করায় দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতাই এখন প্রশ্নের মুখোমুখি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যই এখন ভয়াবহ ও অযৌক্তিক আগ্রাসনের সম্মুখীন। ইরানের সরকার পরিবর্তনের জন্যই যদি এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়, তাহলে এর অভিঘাত শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যেই সীমাদ্ধ থাকবে না; বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকেই প্রভাবিত করবে। ইরানের ধারণা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো দ্রুত যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নেবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে ঐক্য ও শক্ত অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে। কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ হয়তো সামরিক প্রতিক্রিয়ার পক্ষে চাপ প্রয়োগ করতে পারে। এই সংঘাতে রাষ্ট্রগুলো যদি সরাসরি জড়িয়ে পড়ে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মতো বিবেচিত হবে।

 


১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ও তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক শত্রুতামূলক। ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৮ সালে একতরফাভাবে পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান যখন পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ট্রাম্প তখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগের বিরুদ্ধে তেহরানকে সতর্ক করেছেন। ট্রাম্প ইরানকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের পারমাণবিক স্থাপনায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না তিনি, যদি তারা তাদের কার্যক্রম থেকে বিরত না থাকে।

 

 

ইচ্ছাকৃতভাবে পারমাণবিক চুক্তি বিলম্বিত করার জন্যও তিনি ইরানকে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রায় কাছাকাছি। যদিও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতি হুমকির পাশাপাশি ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, বাহরাইনের প্রতিও ইরান সতর্কবার্তা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যে কোনো সংঘাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

ইরান বলেছে, আকাশসীমা বা আঞ্চলিক ক্ষেত্র ব্যবহারসহ ইরানের মাটিতে আক্রমণ শুরু করতে যুুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেয়া হলে তা একটি শত্রুতাপূর্ণ কাজ বলে বিবেচিত হবে এবং ইরান সেই দেশগুলোকে আক্রমণের তালিকায় রাখবে। এদিকে ইরান বিশ^বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে রয়েছে। এটি ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এবং এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করেছে। ইরান অতীতে বেশ কয়েকবার এ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। বিশে^র মোট জ¦ালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

 

 

পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর চাপ দূরে ঠেলে রাখতে ইরান বরাবরই প্রণালিটি বন্ধের হুমকি প্রদান করে। এই প্রণালি বন্ধ হলে বিশ^বাজারে জ¦ালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশি^ক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। ইরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫-১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পুরো অঞ্চলে ইরানের আক্রমণ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদুত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ইরানের ওপর যে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, এর ফলে ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।

 

 

এ সংঘাত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এ যৌথ হামলাকে সম্পূর্ণ উসকানিমূলক, অবৈধ ও অন্যায্য বলে অভিহিত করেছেন। তবে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও কুয়েত ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। বর্তমানে রাষ্ট্রগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি কেবল বাহ্যিক হামলা নয়, বরং তাদের অর্জিত ‘সফট পাওয়ার’ বা ইমেজ রক্ষা করা। পর্যটন ও বিনিয়োগের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যে নিারপদ স্বর্গ হিসেবে রাষ্ট্রগুলো পরিচিত ছিল, সেই ভাবমূর্তি এখন ঝুঁকির মুখে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো হয়তো সরাসির ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ না দিয়ে নিজস্ব সম্মিলিত সামরিক শক্তি পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স বা জিসিসির একক নেতৃত্বে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এটি তাদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিকে জোরালো করবে। তাার কেবল পশ্চিমা শক্তির অনুসারী নয় এমন বার্তাও দিতে পারে। 

 

 


গত মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় আঞ্চলিক নেতাদের উপস্থিতিতে ট্রাম্প মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন যুগের ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ওই সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা জোর করে দেশ পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে না। কিন্তু ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শ, লক্ষ্য বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। এই যুদ্ধটি করছেন ট্রাম্প মূলত ইসরাইল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর স্বার্থে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ফেলো নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, এটি আরও একবার ইসরাইলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের আরম্ভ করা একটি ইচ্ছাধীন যুদ্ধ।

 

 

এটি আসলে আরেকটি ইসরাইলি যুদ্ধ, যা যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পেছনেও নেতানিয়াহুর সক্রিয় প্ররোচনা ছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর ট্রাম্প এই অভিযানকে ন্যায়সঙ্গত মিশন বলে উল্লেখ করে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে নিজেদের নিরাপদ ও বিচ্ছিন্ন রাখার যে নীতি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অনুসরণ করে আসছিল, এ হামলা তা ভুল প্রমাণিত করেছে। এখন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করার নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এ যুদ্ধ ইরানিদের বর্তমান শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই নয়, বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমপর্ণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার অপকৌশল। এদিকে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য নিজেদের ও উপসাগরীয় মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলে জানিয়েছে।

 

 

 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত সূক্ষ্ম কূটনেতিক ভারসাম্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার সক্ষমতা প্রমাণ করা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নয়। তবে ইসরায়েলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেক দীর্ঘমেয়াদি। কারণ তারা বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে হামলা হলে তা ওই অঞ্চলসহ সমগ্র বিশে^র শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেকোনো যুদ্ধে সব সময়ই সাধারণ নাগরিকদের চরম মূল্য দিতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।   

লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়