কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বিরোধিতায় যুদ্ধ চালানো কঠিন

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ [প্রকাশ : খবরের কাগজ, ২০ এপ্রিল ২০২৬]

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বিরোধিতায় যুদ্ধ চালানো কঠিন

এ যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ওপর যে অশনিসংকেত বা যে ঝামেলা তৈরি হয়েছে, তার একটা বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যে জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে সেটা একেবারে অর্থনীতির এপিসেন্টার বলা চলে। সেখানে বিশ্বের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তেল আসা-যাওয়া করছে। শুধু তাই না, একই স্থানে সারের একটা বিরাট সাপ্লাই লাইন আছে। সব মিলিয়ে এমন এক জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে যেখানে অর্থনীতির ওপর প্রেসার আসাটাই স্বাভাবিক। এটাও মনে রাখতে হবে- অর্থনীতির ওপর যত বেশি প্রভাব পড়বে, তত বেশি যুদ্ধ থামানোর জন্য সবাই উঠেপড়ে লাগবে এবং সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।...

 

ইরানযুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে, তাদের মিডিয়া কী বলছে, ট্রাম্প কী বলছেন, ইরানইবা কী বলছে, তার ওপরে ভিত্তি করে একটা উপসংহার টানা এই মুহূর্তে ঠিক হবে না। তারা এখন অনেক কিছুই বলবে। কারণ এখনো আলোচনার অনেক কিছু বাকি আছে। আমাদের যেটা দেখা দরকার, তারা নতুন কিছু করছে কি না। তারা যদিও বলছে যে, এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। যুদ্ধবিরতির যে ভাবনা সেটা কিন্তু এখনো রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি না যে, তারা আবার যুদ্ধ শুরু করেছে বা যুক্তরাষ্ট্র আবার তেহরানে বোমা ফেলছে। আগামীতে ফেলতে পারে, সেটা অন্য কথা। এখন পর্যন্ত তারা তা করেনি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে হরমুজ প্রণালির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বেশ কিছু খবরে বলা হয়েছে, ইরান অনেক দেশের জাহাজের ব্যাপারে কোনো আপত্তি জানাচ্ছে না। বিশেষ করে সব আটকে রেখেছে এ কথাও আবার ঠিক না।

 

 

আমাদের এখনো ওই সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না যে, আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে নেমে পড়ল, যদিও সে শঙ্কাটা এখনো আছে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বড় আকারেই এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আগামীতে একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন আছে। সব মিলে ইরান যে প্রযুক্তির দক্ষতা দেখাল এবং তার চেয়ে বড় কথা হলো, ইরান যে ঐক্যটা দেখাল সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ইরান বড় আকারেই ঐক্য দেখাতে পেরেছে, এমনকি প্রথমদিকে যে উৎসাহ ছিল এবং বেশ কিছু আনন্দ মিছিলও আমরা দেখেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে যে ইরানিরা আছে, তারাও কিন্তু বড় আকারেই সমালোচনা শুরু করেছে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের সিভিলিয়ান যে ইনফ্রাস্ট্রাকচারগুলো আছে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যখন আক্রমণ শুরু করল, একটা বড় ব্রিজ তৈরি করা হচ্ছিল সেটা যখন আক্রমণ করা হলো, তখন আমরা দেখলাম যে, ইরানিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়াল। যুদ্ধের পক্ষে আছে এমন শক্তি এখন একেবারেই কমে গেছে। ইউরোপও পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, তারা এর মধ্যে ঢুকতে চাচ্ছে না। সেটাও একটা বড় ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের স্বপক্ষে যেকোনো যুদ্ধে সবসময় ইউরোপের একাধিক দেশ জড়িত ছিল। এবার সেটা দেখা যাচ্ছে না। যার জন্য এই মুহূর্তে বলা মুশকিল যে, আবার বড় আকারে যুদ্ধ চলবে কি না।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট পাস করবে এবং জনগণকে হয়তো দেখাতে চেষ্টা করবে যে, আমরা শান্তির কাজে লিপ্ত। সেটার কী ইমপ্যাক্ট পড়বে আমরা জানি না। তবে নির্বাচনের আগে এ জিনিসটা বড় আকারেই সে দেখাতে চেষ্টা করবে। আবার নির্বাচনের পর কী হয় সেটা বলা মুশকিল। বিশেষ করে বাংলাদেশকে ওভাবেই চিন্তাভাবনা করা উচিত, যেটাকে ওয়ার্ল্ড সিনারিও বলে। হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হয় বা বাংলাদেশ যেখান থেকে তেল আমদানি বা ডিজেল আমদানি করে সেসব দেশের জাহাজ ছেড়ে দেওয়া হলে আমাদের হয়তো স্বস্তি আসবে। তার মধ্যে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে শুরু করে আরব আমিরাত, বাহরাইন সবাই আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে একটা রি-কনস্ট্রাকশন হতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং সেখানে কিন্তু বাংলাদেশ লাভবানও হতে পারে। কারণ রি-কনস্ট্রাকশন কাজে বড় ধরনের শ্রমিক প্রয়োজন হবে। তার পর কনট্রাক্টর থেকে শুরু করে ফিল্ড লেভেলে ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রিশিয়ান প্রয়োজন হবে। সে জায়গায়ও আমার মনে হয় আমাদের তৎপর হওয়া দরকার। আমাদের মিশনগুলো রি-কনস্ট্রাকশনে বাংলাদেশ অংশীদার হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ যে প্রাইসে করতে পারবে সেটা হয়তো অনেক দেশ পারবে না। অনেক দেশ সে হোমওয়ার্কটা শুরু করেছে এবং সেভাবে তারা হয়তো প্রস্তাবগুলো দেবে। যুদ্ধের আলোচনা কী হবে না হবে, সেটার ওপরে নির্ভর না করে যদি যুদ্ধবিরতি চলতে থাকে তাহলে দেখা দরকার যে, আমরা কোথায় লাভটা নিতে পারি।

 

 

একইভাবে যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, যেটা শুরু হওয়া খুবই কঠিন বিষয়। কারণ যে প্রযুক্তি ইরান দেখিয়েছে সেটাকে যদি আয়ত্তে আনতে হয় বা সেটাকে যদি পুরোপুরি বন্ধ করতে হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে অল আউট যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু অল আউট যুদ্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ প্রস্তুত নয়। এটা স্পষ্টত, তাদের একাধিক জেনারেল ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। সেটাও খেয়াল রাখা দরকার। তাদের ইন্টেলিজেন্স-প্রধানও পদত্যাগ করেছেন। ইউরোপও তাদের সঙ্গে নেই। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরানের জনগণ এখনো ঐক্য ধরে রেখেছে। ইরানের জনগণ যদি ঐক্য ধরে রাখে এবং যে প্রযুক্তি সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে এটা যদি থাকে তাহলে যুদ্ধটা বেশি দিন চলার কথা নয়। ইরানের মধ্যে যদি একটা বিভাজন তারা তৈরি করতে পারে, তাহলে যুদ্ধ অনেক বড় হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন পর্যন্ত যেহেতু ইরানের ঐক্য আছে, তাতে মনে হচ্ছে না যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধের কারণে অর্থনীতির ওপর যে অশনিসংকেত বা যে ঝামেলা তৈরি হয়েছে, তার একটা বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যে জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে সেটা একেবারে অর্থনীতির এপিসেন্টার বলা চলে। সেখানে বিশ্বের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তেল আসা-যাওয়া করছে। শুধু তাই না, একই স্থানে সারের একটা বিরাট সাপ্লাই লাইন আছে। সব মিলিয়ে এমন এক জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে যেখানে অর্থনীতির ওপর প্রেসার আসাটাই স্বাভাবিক। এটাও মনে রাখতে হবে- অর্থনীতির ওপর যত বেশি প্রভাব পড়বে, তত বেশি যুদ্ধ থামানোর জন্য সবাই উঠেপড়ে লাগবে এবং সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে বলতে গেলে লাভটা হচ্ছে মূলত যারা অস্ত্র উৎপাদন করে তাদেরই। সেখানে যদি ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার মিলিটারি বাজেট পাস হয়, তাহলে তো যা লাভ করার লাভ করে ফেলল। তার পর আবার হয়তো অপেক্ষা করবে যে অন্য জায়গায় যুদ্ধ করা যায় কি না বা যুদ্ধ পরিস্থিতি রাখা যায় কি না।

 

 

 

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এখানে একটা বড় ভূমিকা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটা চেষ্টা এখনো আছে। সেটাও দেখা দরকার। সেটা হলো ইরান এখন পর্যন্ত যে আক্রমণ করছে সেটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপরে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপরে আক্রমণ করার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ এখনো বড় আকারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তারা হয় ইরানের পক্ষে না হয় এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তাদের যে সরকার বা রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বা যুক্তরাষ্ট্রের পকেটে সেটা কিন্তু জনগণ ভালোভাবে নিচ্ছে না। ইরানের যে প্রযুক্তি, যদি ওই ধরনের কোনো কাঠামো তৈরি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল বড় আকারে আক্রমণ শুরু করে তাহলে ইরানও আক্রমণ করবে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ টিকে থাকবে কি না সেটাও প্রশ্ন। সে জায়গায় আমার মনে যে, জনগণের যদি ঐক্য থাকে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যদি যুদ্ধের বিরোধিতা করে, তাহলে এ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। 

 

 

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়